ad code

কামিনী কাঞ্চন সদা সন্ন্যাসীর পরম বাঁধা

101_0366বনভন্তে-

এক সময় শ্রদ্ধেয় বনভন্তে নিজ আবাসিক ভবনে ভিক্ষুসঙ্ঘকে ধর্মদেশনা প্রসঙ্গে বলেন- যারা অলস, নিদ্রাসক্ত, হীনবীর্য তারা নবলোকোত্তর ধর্ম আয়ত্ব করতে পারে না।তোমরা অলস হবে না, অতিরিক্ত (চার ঘন্টার অধিক) ঘুমাবে না এবং বীর্যবান হয়ে যাও। এতে তোমরা নবকোলোত্তর ধর্ম আয়ত্ব করতে পারবে। আমার সাথে বলো ‘‘অলস হলে, অতিরিক্ত ঘুমিয়ে থাকলে, হীনবীর্য হলে, নবলোকোত্তর ধর্ম আয়ত্ব করা যায় না’’তোমরা অলস হবে না, অতিরিক্ত ঘুমিয়ে থাকবে না এবং হীনবীর্য বা কাপুরষ হবে না। বরঞ্চ দৃঢ় বীর্যবান বা মহাপুরষ হয়ে যাও। তবেই নবলোকোত্তর ধর্ম আয়ত্ব করা সম্ভব হবে। নবলোকোত্তর ধর্ম সমূহ আয়ত্ব করতে পারলে সুখ লাভ হয়। নবলোকোত্তর ধর্ম সমূহ আয়ত্ব না হলে দুঃখ ভোগ করতে হবে। তোমরা সকলে নবলোকোত্তর ধর্ম আয়ত্ব করতে সচেষ্ট থাক । জগতে গৌতম বুদ্ধের শাসন এখনো রয়েছে, ফুরিয়ে যায়নি। কাজেই নবলোকোত্তর ধর্ম আয়ত্ব করার সময় এখনো আছে। দৃঢ় বীর্যের সহিত চেষ্টা করলে বর্তমানেও নবলোকোত্তর ধর্ম আয়ত্ব করা সম্ভব হবে। নবকোলোত্তর ধর্ম আয়ত্ব হলে জন্ম-মৃত্যু নিরোধ হয়, তৃষ্ণা ধ্বংস, ক্ষয় সাধন হয়ে যায়; ক্লেশসমূহ চিরতরে নিবৃত্তি ঘটে। ক্লেশসমূহ নিবৃত্তি ঘটাতে তোমাদেরকে দশবিধ ক্লেশের সহিত যুদ্ধ করতে হবে। কি ভাবে যুদ্ধ করবে? সর্বদা অনিত্য-দুঃখ-অনাÍ’’, ‘‘অনিত্য-দুঃখ-অনাÍ’’ জপ করে করে ক্লেশের সহিত যুদ্ধ করতে হবে। এইভাবে দশবিধ ক্লেশ বা ক্লেশমারকে অনিত্য-দুঃখ-অনাÍ ত্রিলক্ষণ জ্ঞানের দ্বারা যুদ্ধে পরাজিত করতে হবে। ক্লেশসমূহের তাড়নায় কেহ নির্মল সুখের অধিকারী হতে পারে না। আমার সাথে বলো ক্লেশ আমাদের নিত্য দুঃখদায়কদশবিধ ক্লেশ সমূহ তোমাদেরকে নিত্য দুঃখ প্রদান করতেছে। বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন– তোমাদেরকে কে নিত্য দুঃখ প্রদান করতেছে? ভন্তে, ক্লেশই। হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। সাধারণ মানুষ দুঃখ পেয়ে মনে করে অমুক ব্যক্তির জন্য আমি দুঃখ পাচ্ছি; কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ ভূল কথা। অমুক ব্যক্তি নয়, দশবিধ ক্লেশ বা ক্লেশমারই সত্ত্বগণকে দুঃখ প্রদান করে থাকে। জগতে যা কিছু দুঃখ পেতে হয় তাএকমাত্র ক্লেশ মারের জন্যই। তাই তোমরা সত্বর ক্লেশের সহিত যুদ্ধ কর। যুদ্ধে ক্লেশকে পরাজিত করে দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করতঃ পরম সুখ নির্বাণ প্রত্যক্ষ কর।

 

 

 

কামলোক, রূপলোক, অরূপলোক এত্রিলোকের মধ্যে নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ করা যায় না। এত্রিলোককে বলা হয় মার ভূবন। অমার ভূবনের মধ্যে নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ করতে হয়। অমার ভূবন কাকে বলে? স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী, অর্হৎ মার্গস্থ, ফলস্থ এবং নির্বাণ এই নবলোকোত্তর ধর্মকে বলা হয় অমার ভূবন। তোমরা অলস হবে না, অত্যধিক ঘুম যাবে না, হীনবীর্য হবে না তাহলে নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ হবে। যারা অলস, কর্তব্য কাজে অবহেলা করে, সর্বদা ঘুমের মধ্যে সময় কাটায়, হীনবীর্য, উৎসাহ শূন্য তাদের নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ হয় না। মহাজ্ঞানী সারিপুত্র থেরো বলেছেন-

 

পাপ, আলস্য, হীনবীর্য যারা পরায়ণ,

 

তাদের সনে আমি না দেখি কখন।

 

বনভন্তে এগাথাটি কয়েকবার গেয়ে যান। তারপর বলেন, তোমরা আমার সাথে বলো পাপী, আলস্য পরায়ণ এবং হীনবীর্য ব্যক্তির সহিত আমাদের যেন কখনো সাক্ষাৎ না হয়পাপ কর্মে রত, আলস্য পরায়ণ হীনবীর্য ব্যক্তিদেরকে দেখলেও দুঃখ বলে জানবে। এরূপ ব্যক্তিরা কখনো নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয় না। তজ্জন্য আমি তোমাদেরকে কোথাও যেতে দিই না। কারন বর্তমানে সবখানেতে পাপী, আলস্য পরায়ণ ও হীনবীর্য ব্যক্তি রয়েছে। বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন- বর্তমান সবখানেতে কি ধরনের ব্যক্তি দেখা যায়? পাপ, আলস্য পরায়ণ ও হীনবীর্য ব্যক্তি।

 

তিনি আরো বলেন- তোমরা যখন প্রব্রজিত হয়েছ তাই এখন তোমাদের কর্তব্য হল, দুঃখপূর্ণ সমস্ত ধর্ম ত্যাগ করে সকল বিষয়ে অনাসক্ত থাকা। দুঃখপূর্ণ ধর্ম সমূহ ত্যাগ করতঃ সকল বিষয়ে অনাসক্ত থাকাই সুখ। তোমরা যদি সেভাবে থাকতে পার তাহলে প্রব্রজিত জীবন যে কতটুকু সুখের হতে পারে তাহৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে। আমার সাথে বলো আমরা সমস্ত দুঃখ ধর্ম ত্যাগ করে সকল বিষয়ে অনাসক্ত থেকে প্রব্রজিত সুখ অনুভব করবপূজ্য বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করে বলেন– তোমরা সমস্ত দুঃখ ধর্ম ত্যাগ করে সকল বিষয়ে অনাসক্ত থাকতে পারবে কি? ভন্তে, আপ্রাণ চেষ্টা করব। যদি পার তাহলে তোমাদের অবশ্যই প্রব্রজিত জীবনের প্রকৃত সুখ লাভ হবে। এবং এটা হবে তোমাদের জন্য পরম ভাগ্যের ব্যাপার। এবার পূজ্য বনভন্তে আবারো ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন- প্রব্রজিত জীবনের সুখ কিভাবে লাভ হয়? ভন্তে, সমস্ত দুঃখ ধর্ম ত্যাগ করে অনাসক্ত হলে প্রব্রজিত জীবনের সুখ লাভ হয়। হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। তোমরা সমস্ত দুঃখ ধর্ম ত্যাগ করতঃ সকল বিষয়ে অনাসক্ত থেকে প্রব্রজিত জীবনের সুখ উপলব্দি করতে সচেষ্ট থাক। কখনো আলস্য পরায়ণ হবে না এবং সারা রাত্রি নিদ্রায় কাটিয়ে দেবে না। আমি তো সারা রাত্রি এই চেয়ারটিতে বসেই থাকি; ঘুমাই না। তখন আমার অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়ে সব ভিক্ষুরা ঘুমাচ্ছে। এইভাবে রাত যত গভীর হতে গভীরতর হতে চলে ততই আমার নিত্য নতুন বিষয়ে জ্ঞানোদয় হয়। মনে রাখবে, রাত্রিতে চিত্ত বেশী সমাধিস্থ হয়ে থাকে বলে তখন বেশী জ্ঞানোদয় হয়। কিন্তু সারারাত ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলে কোন বিষয়ে জ্ঞানোদয় হবার সুযোগ থাকে না। উপমা কথা, ধর দুই জন শিকারী শিকার খোঁজে তাদের দুই নির্ধারিত মাচায় গিয়ে শিকারের অপেক্ষায় রয়েছে। ইত্যবসরে এক জন শিকারী ঘুমিয়ে পড়ল। আর সেই ঘুমের ঘোরে রাত্রি শেষে ভোর হল। ভোরে জেগে উঠে দেখে সব শিকার হাতছাড়া হয়ে গেছে; তার পক্ষে আর শিকার পাওয়া সম্ভব হল না। অন্যদিকে অপর শিকারীটি রাত্রিতে ঘুমায়নি বলে শিকার হাতে বাড়ি ফিরল। ঠিক তদ্রপ তেমরাও যদি সারারাত নিদ্রায় কাটিয়ে দাও তাহলে কোন বিষয়ে জ্ঞানোদয় হবে না। আর যদি রাত্রিতে জেগে থেকে চিত্তকে সমাধিস্থ কর তাহলে ইচ্ছা মত জ্ঞান আহরণ করতে পারবে বা নব নব বিষয়ে জ্ঞানোদয় হবে। ঘুম হল অজ্ঞান, জাগ্রত হল জ্ঞান। ঘুমের সময় কোন জ্ঞানোদয় হবার অবকাশ নেই; বরং অজ্ঞানই বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রাত্রিতে জাগ্রত থাকলে, চিত্ত সমাধিস্থ করলে একের পর এক জ্ঞানের ভা- পূর্ণ হয়ে থাকে।

 

তোমরা যে কোন বিষয় দেখলে দেখতে পার, শুনলে শুনতে পার, অনুমান করলে অনুমান করতে পারছ বলে জানবে; কিন্তু তাতে আসক্ত হবে না। অনাসক্তভাবে অবস্থান করবে। এবম্বিধ উপায়ে যে কোন বিষয়ে অনাসক্ত থাকতে পারলে নির্বাণ লাভ করা সম্ভব। যেমন- কোন একজন সুন্দরী রমনীকে দেখলে তাতে অনাসক্ত থাকবে; আসক্ত হবে না। অনাসক্ত থাকলে তোমার চিত্তে সেই রমনীর কথা রেখাপাত করতে পারবে না। এবং চিত্তের মধ্যে সেই রমনী সম্পর্কিত কোন ভাবেরও উদয় হবে না। কোন মনোজ্ঞ শব্দ শুনলেও তাতে অনাসক্ত থাকবে। সেই মনোজ্ঞ শব্দের প্রতি আসক্ত হবে না। অনাসক্ত থাকলে সেই শব্দের কথা তোমার চিত্তে রেখাপাত করতে পারবে না। এবং চিত্তের মধ্যে তা পুনঃ পুনঃ শুনারও চিন্তা উদয় হবে না। কোন বিষয়ে অনুমান করলেও তাতে অনাসক্ত থাকবে। সে অনুমিত বিষয়ের প্রতি আসক্ত হবে না। অনাসক্ত থাকলে চিত্তের মধ্যে সে অনুমিত বিষয়ে কোন রেখাপাত করতে পারবে না। এবং সে বিষয়ে পুনঃ পুনঃ অনুমান করার ইচ্ছাও জাগবে না। এইভাবে দর্শনে, শ্রবণে, অনুমানে অনাসক্ত থাকলে সেই দর্শন-শ্রবণ-অনুমান সম্পর্কিত কোন চিত্ত উদয় হবে না। তাতে লোভ, দ্বেষ, মোহ উৎপন্ন হয়ে কোন প্রকার দুঃখ পাবারও সম্ভাবনা থাকবে না। এভাবে সর্ব বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকাই সুখ। আমার সাথে বলো আমরা কোন বিষয় দেখলেও, শুনলেও, অনুমান করলেও তাতে আসক্ত হবো নাএইভাবে দর্শনে, শ্রবণে, অনুমানে অনাসক্ত থাকলে নির্বাণ লাভ হয়। অর্থাৎ চক্ষু দ্বারা কোন কিছু দেখলে তাতে অনাসক্ত, কর্ণের দ্বারা কোন শব্দ শুনলে তাতে অনাসক্ত এবং মনের দ্বারা কোন বিষয় অনুমান করলে তাতে অনাসক্ত থাকাই নির্বাণ সুখ। এবার পূজ্য বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন- বল তো কোন বিষয় দেখলে, শুনলে, অনুমান করলে তোমাদেরকে কিভাবে থাকতে হবে? ভন্তে, অনাসক্তভাবে। বনভন্তে-হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। অনাসক্তভাবে থাকতে পারলে তোমরা নির্বাণ লাভ করতে পারবে। তবে যদি আসক্ত হয়ে থাক তাহলে জানবে তোমাদের আর দুঃখের সীমা থাকবে না। তাই আবারো বলছি, কোন বিষয় দেখলে দেখতে পার, শুনলে শুনতে পার, অনুমান করলে অনুমান করতে পার কিন্তু তাতে আসক্ত হবে না। সকল বিষয়ে অনাসক্তভাবে অবস্থান কর। অনাসক্তভাবে অবস্থান করলে তোমাদের চিত্তে লোভ, দ্বেষ, মোহ উৎপন্ন হতে পারবে না। আর যাবতীয় দুঃখের চির নিবৃত্তি ঘটবে।

 

পূজ্য বনভন্তে বলেন- কামিনী কাঞ্চন সদা, সন্ন্যাসীর পরম বাঁধাকামিনী কাঞ্চনের মায়া জালে আবদ্ধ না হয়ে সন্ন্যাসী জীবন যাপন করা সহজ কথা নয়। স্ত্রী-পুত্র, মনি কু-লের এই বন্ধন ছিন্ন করা কঠিন। এ বন্ধন লৌহ কারাগারের অপেক্ষা শিথিল হলেও ছিন্ন করা দুঃসাধ্য। তাই লৌহ কারাগারের বন্ধন প্রকৃত বন্ধন নয়, কিন্তু কামিনী কাঞ্চনের তথা স্ত্রী-পুত্রের দ্বারা যে বন্ধন রচনা হয় তাই প্রকৃত বন্ধন। সন্ন্যাস জীবন যাপনের পথে এ বাঁধা অতিক্রম করা বড়োই দূর্ভেদ্য। তবে জ্ঞান থাকলে সে কঠিন কাজেও সফলকাম হওয়া যায়। জ্ঞানীরা কামিনী কাঞ্চনের মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে মুক্তির পথ সন্ন্যাস জীবন যাপন করতে সক্ষম। কিন্তু অজ্ঞানী ব্যক্তিরা কামিনী কাঞ্চনের মায়ার জালে মোহিত হয়ে থাকে। তাদের পক্ষে মুক্তির পথ সন্ন্যাসী  জীবন যাপন করা সম্ভব হয় না। তোমাদের যদি জ্ঞান থাকে তাহলে তোমরা কামিনী কাঞ্চনের মায়া জালকে দুঃখ, মিথ্যা, পাপ এবং মুক্তি পথের বড়ো বাঁধা বলে জানবে। আর সেই মায়ার জালকে ছিন্ন ভিন্ন করতঃ সন্ন্যাস জীবন যাপন করতে পারবে। অজ্ঞানী ব্যক্তিরা কামিনী কাঞ্চনের মায়াজালকে সত্য, সুখ, পুণ্য মনে করতঃ তাতে আসক্ত হয়ে যায়। তজ্জন্য অজ্ঞানী ব্যক্তিদের পক্ষে কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করে মুক্তির পথ অনুসন্ধান করা সম্ভবপর হয় না। তোমরা চারি আর্যসত্য জ্ঞান, প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি জ্ঞান, আসব ক্ষয় জ্ঞান অর্জন করতে সচেষ্ট থাক। তাহলে কোন কামিনী কাঞ্চনেই তোমাদেরকে মায়াজালে আবদ্ধ করতে পারবে না; তোমরা দুঃখমুক্তি পরম সুখ নির্বাণ লাভে সমর্থ হবে। পূজ্য বনভন্তে এবার ভিক্ষুসঙ্ঘের উদ্দেশ্যে বলেন- তোমরা যুবতী মেয়েদেরকে থানার দারোগা বলে জানবে। থানা দারোগা হতে সাবধান। থানার দারোগা আসামী পেলে যেমন গ্রেপ্তার করে ঠিক যুবতী মেয়েরাও তোমাদেরকে বশীভূত করতে চাইবে। বৃদ্ধ নারীরা হল পেনশন পাওয়া (অবসরপ্রাপ্ত) দারোগা। তারা বর্তমানে গ্রেপ্তার করতে পারবে না। তবে তারা নতুন দারোগারূপী যুবতীদের হতে অভিজ্ঞ। যুবতীরা এখনো তাদের মত অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে বৃদ্ধ নারীরা তাদের সেই অভিজ্ঞতা যুবতীদেরকে শিখায়ে দিতে পারে। আর তাহলে যুবতীরা সহজেই তাদের আসামীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে। তবে থানার দারোগা কি সবাইকে গ্রেপ্তার করে? করে না, যারা আসামী শুধুমাত্র তাদেরকে গ্রেপ্তার করে। যুবতীরাও তোমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করতে পারবে না। কেবল মাত্র যেই ভিক্ষুরা তাদের সাথে হাসি, ঠাট্টা, তামাশায় রত হয়, লোভ চিত্তে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, সাধারণ যুবক-যুবতীরা যে আচার-আচরণ ও মনন করে সেইরূপ আচার-আচরণ ও মননে লিপ্ত ভিক্ষুগণকেই বেছে বেছে তারা গ্রেপ্তার করবে। বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে বললেন, তোমরা কি ধরণের আচার-আচরণ করলে যুবতীদের আসামী হবে জান? যদি কোন যুবতীকে বল তোমাকে আমার ভাল লাগে, মনোপুত হয়; পেলে তোমাকে বিয়ে করবতাহলে সঙ্গে সঙ্গে যুবতীটি তোমাকে আসামী বলে সনাক্ত করতঃ গ্রেপ্তার করে ফেলবে। তখন কোন জামিনেও ছাড়া পাওয়া যাবে না। কাজেই তোমরা সেই অনার্য আচার-আচরণ করবে না। সর্বদা যুবতীদের হতে নিজকে পৃথক করে বহু দূরে সরিয়ে রাখতে সচেতন থাকবে। যদি যুবতীদের সাথে সাধারণ যুবক-যুবতী সুলভ আচার-আচরণ কর তাহলে যুবতীরা তোমাদেরকে আসামী বানিয়ে ফেলবে, আর সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করতঃ প্রব্রজ্যা পরিত্যাগ করতে বাধ্য করাবে। আমি  তোমাদেরকে বার বার হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি যুবতীদের দিকে লোভ চিত্তে তাকিয়ে থাকবে না, তাদের সাথে হাসি, ঠাট্টা, তামাশা সহ বাজে কথায় রত থাকবে না, হীন আচার-আচরণ করবে না। সর্বোপরি, থানার দারোগার মতো ভয় জ্ঞানে দর্শন করবে। বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন-যুবতীদেরকে কি মনে করবে? ভন্তে, থানার দারোগা। তোমরা তাদের আসামী হবে কি? না ভন্তে, হবো না। বনভন্তে তবুও বলেন- নাকি আসামী হতে ইচ্ছা হয়? যার যার ইচ্ছা হয় আমাকে বল। পূজ্য ভন্তে এরূপ বললে ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। আসামী হবার ইচ্ছা হলে তাকে আর বেশী বুঝানো সম্ভব হবে না। মনে রাখবে, ভিক্ষুদের মধ্যে যাদের জ্ঞানশক্তির অভাব তারাই যুবতীদের সাথে অনার্য আচার-আচরণে রত হয়, যুবতীদের আসামী হবার মন নিয়ে অবস্থান করে। যারা সেইরূপ হীনমন, হীন আকাক্সক্ষা, হীন জ্ঞান নিয়ে অবস্থান করছে তাদের তো বুঝিয়ে লাভ নেই। বনভন্তে বলেন, আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, যারা সেই রকম হীন, অনার্য, পাপচিত্তে অবস্থান করতেছে আমি তাদেরকে আমার সান্নিধ্যে রাখব না। সুতরাং তোমরা সবাই সাবধান হয়ে যাও। আমার সান্নিধ্যে থাকলে ভালভাবে থাকতে হবে। বুদ্ধের শাসনে হীন, অনার্য, খারাপ (বজং) ব্যক্তির স্থান হয় না। মহাসমুদ্রের একগুণ কি? হ্যাঁ, মহাসমুদ্রের মধ্যে কোন মরা, পঁচা, আবর্জনা স্তুপ থাকতে পারে না, মহাসমুদ্র সেই মরা, পঁচাকে তীরে তুলে দেয়। ঠিক তদ্রপ বুদ্ধের শাসনেও হীন, অনার্য আচার-আচরণ সম্পন্ন দুঃশীল ভিক্ষুর স্থান নেই। বুদ্ধ শাসনের পবিত্রতা তাকে বহু দূরে নিক্ষেপ করে রাখে। অন্য দিকে যুবতীদের মধ্যে যারা ভাল স্বভাবের তারাও ভিক্ষুদের সাথে হীন, অনার্য আচার-আচরণে রত হবে না। যারা খারাপ (বজং) স্বভাবের একমাত্র তারা হীন, অনার্য আচার-আচরণ করে থাকে।

 

         তোমরা কামলোকের প্রতি চিত্ত রমিত করবে না, রূপলোকের প্রতি চিত্ত রমিত করবে না, অরূপলোকের প্রতি চিত্ত রমিত করবে না। কারন কামলোকের প্রতি চিত্ত রমিত করলে দুঃখ পেতে হয়, রূপলোকের প্রতি চিত্ত রমিত করলে দুঃখ পেতে হয়, অরূপলোকের প্রতি চিত্ত রমিত করলে দুঃখ পেতে হয়। কামলোকের চিত্তে তৃষ্ণা থাকে, রূপলোকের চিত্তে তৃষ্ণা থাকে, অরূপলোকের চিত্তে তৃষ্ণা থাকে। ফলে দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। তোমরা লোকোত্তর চিত্ত উদয় করতে সচেষ্ট থাক। লোকোত্তর চিত্তে তৃষ্ণা থাকতে পারে না। তাই একমাত্র লোকোত্তর চিত্তই সুখ। কামলোকে, রূপলোকে, অরূপলোকে সত্ত্বগণ যথাক্রমে মনুষ্য-দেবতা-ব্রহ্মা প্রত্যেকের তৃষ্ণা বিদ্যমান রয়েছে বলে তারা দুঃখের মধ্যে অবস্থান করতেছে। যদিও বা মনুষ্যদের তুলনায় দেবতা-ব্রহ্মারা কিছুটা সুখ করে থাকে। যেমন কোন ধনী ব্যক্তি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা সহ বেশ কিছু ধন জমা করল। এখন সেই সঞ্চয়কৃত ধন-সম্পদ দ্বারা বিনা কায়ক্লেশে বেশ কিছু  দিন কাজ না করে আরাম-আয়েশের মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারে। তা নয় কি? কিন্তু সেই টাকাগুলো তো আর সর্বদা স্থিতি থাকবে না, ফুরিয়ে যাবে। যখন ফুরিয়ে যাবে তখন তাকে আবারো টাকা উপার্জনের জন্যে কাজ করতে হবে। ঠিক তদ্রপ দেব-ব্রহ্মলোকে পূর্বজর্নে¥র সঞ্চিত পুণ্যের প্রভাবে স্বর্গ, ব্রহ্মলোকে উৎপন্ন হয়ে সুখের মধ্যে অবস্থান করতেছে। তবে সেই সঞ্চিত পুণ্যের ক্ষয়সাধন হলে তাদেরকেও হীনকুলে জন্ম গ্রহণ করতঃ দুঃখভোগ করতে হবে। কারন বর্তমানে তারা তো পুণ্য সঞ্চয় করতে পারছে না। এই সব কারনে নির্বাণ ব্যতীত কোথাও প্রকৃত সুখ নেই, নিরাপদ আশ্রয় নেই, দুঃখের হাত থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় নেই। অন্যদিকে, ভগবান বুদ্ধ মনুষ্য জন্মকে দুর্লভ বলেছেন। কারন মনুষ্য জন্ম থেকে দুঃখ মুক্তি নির্বাণ লাভ করা সহজ। দেবতা, ব্রহ্মদের সুখের ভাগ বেশী বলে তারা দুঃখমুক্তি বুঝতে চায় না বা বুঝে না। আর চারি অপায়ে সর্বদা দুর্বিসহ দুঃখের জ্বালায় দুঃখমুক্তির কথা বুঝার সুযোগ থাকে না। কিন্তু মনুষ্যরা সুখ দুঃখ উভয়ই অনুভব করে বলে তাদের পক্ষে দুঃখমুক্তির উপায় উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়। তারা সুখ দুঃখ উভয় থেকে মুক্ত হওত নির্বাণ লাভে সক্ষম হয়। তজ্জন্য আবারো বলছি, তোমরা কামলোক, রূপলোক, অরূপলোকের চিত্ত ধারণা না করে লোকোত্তর চিত্ত বা নির্বাণের চিত্ত উদয় করতে সচেষ্ট থাক। এতেই সকল প্রকার দুঃখের চির অবসান হয়ে অজর অমর নির্বাণ সুখ লাভ হবে।

 

পরিশেষে তিনি বলেন- তোমরা মারের সঙ্গে যুদ্ধ কর। আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা থাকলে মারের সঙ্গে যুদ্ধ করা যায় না; সহজে মার পরাজিত করে ফেলে। তাহলে কিভাবে মারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে? আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা ভাব পরিত্যাগ করে। আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা পরিত্যাগ করে মারের সঙ্গে যুদ্ধ করলে মার পরাজিত হয়। আলস্য, ঘুম থাকলে ধ্যান করা যায় না। আলস্যভাব ধ্যান করার যাবতীয় উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রচেষ্টাকে নষ্ট করে দেয়। আর ঘুম ধ্যান করার সময়টুকু হরণ করে নেয়। ভগবান বুদ্ধ আলস্যতা এবং ঘুমকে কারাগার বলে অভিহিত করেছেন। কারাগারে বন্দিকৃত কয়েদিগণ যেমন স্বীয় ইচ্ছানুরূপ স্বাধীনভাবে কোন কিছু করতে পারে না, ঠিক তদ্রপ আলস্য, ঘুমে আচ্ছন্ন ব্যক্তিগণও সেই আলস্য, ঘুমের জন্য কোন কাজ সঠিকভাবে, সুচাররূপে সম্পন্ন করতে পারে না। তাই বলা হয়েছে-

 

কারাগার তুল্য জান আলস্য, তন্দ্রায়,

 

ধ্যানেতে জন্মায় বাঁধা, কার্যে অন্তরায়।

 

দাসত্বের তুল্য জান চাঞ্চল্য শোধনে,

 

পরাধীন থাকে সদা অতি ক্ষুদ্র মনে।

 

তোমরা আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা পরিত্যাগ করে মারের সঙ্গে যুদ্ধ কর। আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা ত্যাগ না করলে মারকে পরাজিত করতে পারবে না। বরং মারই তোমাদেরকে পরাজিত করবে। বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে তখন প্রশ্ন করেন, কি করে মারকে পরাজিত করবে? ভন্তে! আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা ত্যাগ করে। হ্যাঁ; আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা ত্যাগ করতে না পারলে মার তোমাদেরকে সহজেই পরাজিত করে ফেলবে। মার যাতে তোমাদেরকে পরাজিত করতে না পারে তজ্জন্য তোমরা আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা পরিত্যাগ কর। আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতাকে কিছুতেই চিত্তের মধ্যে স্থান দিবে না। তোমরা চিত্তের মধ্যে প্রবল বীর্য উৎপন্ন কর। এবং সেই বীর্যের দ্বারা আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা ত্যাগ করতঃ মারকে পরাজিত করতে সচেষ্ট থাক। শরীরে বা মনে কোন প্রকার আলস্যভাব উদয় হলে সঙ্গে সঙ্গে সেটা দূর করে দিবে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কেবল মাত্র চার ঘন্টা ঘুমাবে, বাকি বিশ ঘন্টা জাগ্রত থাকবে। চঞ্চলতা ভাবকে স্মৃতির সহিত দমন করবে। মনে রাখবে, আলস্য ত্যাগ, ঘুম ত্যাগ ও চঞ্চলতা ত্যাগ করা তোমাদের কাজ। বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে বলেন, তাহলে তোমাদের কাজ কি? ভন্তে; আলস্য ত্যাগ করা, ঘুম ত্যাগ করা ও চঞ্চলতা ত্যাগ করা আমাদের কাজ। যাঁরা অর্হৎ তাঁদের আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা বিন্দুমাত্রও থাকতে পারে না। অর্হৎগণ আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা হতে মুক্ত। বনভন্তে বলেন, তোমরা খুব বেশী কথা বলবে না; বাজে কথা, গল্প গুজব করে সময় নষ্ট করবে না। সমস্ত দিন আলাপে-সালাপে কাটিয়ে, সারা রাত্রি নিদ্রা গিয়ে, অজ্ঞানী ব্যক্তি কবে সংসার থেকে মুক্ত হবে? হতে পারবে না। তোমরা সেই অজ্ঞানী ব্যক্তির মত সমস্ত দিন আলাপে-সালাপে কাটিয়ে, সারারাত্রি নিদ্রা গিয়ে সময় ও সুযোগ নষ্ট করবে না। যদি নষ্ট কর তাহলে কখনো সংসার দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারবে না। তাই আমার সাথে বলো সমস্ত দিন আলাপে-সালাপে কাটিয়ে, সারারাত্রি নিদ্রা গিয়ে অজ্ঞানী ব্যক্তি কবে সংসার দুঃখ থেকে মুক্ত হবে? হতে পারবে নাতোমরা সেই অজ্ঞানী ব্যক্তি না হয়ে অতি সহসা আলস্য, ঘুম, চঞ্চলতা ত্যাগ করে মারকে যুদ্ধে পরাজিত করতঃ সংসার দুঃখ হতে মুক্ত হয়ে নির্বাণ পরম সুখে অবস্থান কর।

সাধু সাধু সাধু।

আর্যশ্রাবক শ্রদ্য়ে বনভন্তের দেশনা

সিরিজ-৩

সম্পাদনায়- ইন্দ্রগুপ্ত ভিক্ষু

 

Joint Us

Calender

October 2017
M T W T F S S
« Feb    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

Photos on Flickr